সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে হাসনাত ও সারজিসের ফেসবুক পোস্টে দলে অস্বস্তি-অসন্তোষ
কানাডায় আগাম নির্বাচনের ঘোষণা, ভোট ২৮ এপ্রিল
জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সবাইকে কাজ করার আহ্বান তারেক রহমানের
হামাসকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানালো ফাতাহ
প্রকৃতিবিনাশী ও বৈষম্যপূর্ণ সব প্রকল্প বাতিল করতে হবে: আনু মুহাম্মদ
গণপরিষদের প্রয়োজন দেখছে না বিএনপি
কারামুক্ত হলেন তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী
আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে হবে: নাহিদ ইসলাম
লোহাগাড়ায় কাপড় কাটার কাঁচির আঘাতে জামায়াত নেতা খুন
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি, ২০২২
ভ্যাপসা গরমে প্রতিবছর ৩২০০ কোটি কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। ছবি সংগৃহীত
এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত, খোলা স্থানে ভারী কাজ করা মানুষের কর্মঘণ্টা কমার বিষয়টি উঠে এসেছে এতে।
মো. জহুরুল হক গত ১৮ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালান। সপ্তাহে ছয় দিন দৈনিক সাত থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম দেন তিনি। এক্ষেত্রে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে তাকে।
জহুরুল বলেন, ‘গামছা প্যাচ দিয়ে থাকলেও এমন তাপে মাথা গরম হয়ে যায়। খালি ঘামতে থাকি। ঘন ঘন অসুখ হয়। শরীরে বল পাই না। গরমে বেশি ঘুম ধরে। এতে কাজ করা যায় না। আবার গরমে বাসাতেও ঘুম ধরে না।’
ফরিদপুরের কানাইপুর ইউনিয়নের কৃষক কলম চকদার জানান, তীব্র গরমে ধান ও পাট কাটতে হয় তাদের। এ কাজে বিরতি দেয়ার সুযোগ থাকে না।
তিনি বলেন, ‘মাঠে তীব্র রোদে কাজ করতে হয় আমাদের। এতে অনেক কষ্ট হয়। তিন-চার ঘণ্টা কাজ করে হাঁপায় যাই। পরে ভাগা দিয়ে কাজ করি। আমরা পাঁচজন, এরপরে আরও পাঁচজন। গরমে টানা কাজ করায় মাথা ঘুরে।’
তাদের মতো কৃষি ও নির্মাণ শিল্পে কায়িক শ্রমের কাজ করা শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর এমন দমবন্ধ তাপমাত্রা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বিষয়টি এতদিন গুরুত্ব পায়নি। তবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যে নতুন এ গবেষণা সামনে এলো।
বছরে ক্ষতি ২ লাখ কোটি ডলার
১৯৮১- ২০০০ সালের গবেষণার সঙ্গে ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত করা গবেষণা তুলনা করেন গবেষকরা। হিউমিড হিট শ্রম ও উৎপাদনশীলতার ওপর কেমন প্রভাব ফেলে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা নিতে এ কাজ করেন তারা।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০০১- ২০২০ সালে ভ্যাপসা গরমে মানুষের বাইরে কাজ করা ক্রমেই কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সবশেষ ২০ বছরে সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬৭ হাজার ৭০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যা আগের ২০ বছরে তুলনায় ৪০০ ঘণ্টা বেশি। টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবছর ২ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি। যার পরিমাণ করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী মোট আর্থিক ক্ষতির প্রায় সমান।
এর মধ্যে ভারত প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ কোটি কর্মঘণ্টা হারিয়েছে। চীন হারিয়েছে ৭২০০ কোটি ঘণ্টা। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারত গত ২০ বছর আগের ২০ বছরের তুলনায় প্রতিবছরে অতিরিক্ত ২৫০০ কোটি কর্মঘণ্টা হারিয়েছে। একই সময়ে চীন হারিয়েছে বছরে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি ঘণ্টা।
আরও পড়ুন: শান্ত নারায়ণগঞ্জ, তবে পরতে পরতে ভোটের আমেজ
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জিডিপি
হিউমিড হিটের কারণে ভবিষ্যতে কী ধরনের ক্ষতি হবে তা এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে চলমান পরিস্থিতি গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। বলা হচ্ছে, এমন প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুহার বাড়ছে। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এতে দেশের জিডিপিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন অক্ষাংশের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো।
গবেষণায় উঠে আসে, বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তিন চতুর্থাংশ এমন জায়গায় বসবাস করছেন; যেখানে জলবায়ু পরিস্থিতি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ কারণে প্রতিবছর একজন মানুষের ১০০ কর্মঘণ্টা অপচয় হতে পারে।
এ ব্যাপারে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক লুক পার্সনস বলেন, শ্রমিকরা এমন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় উৎপাদনশীলতা হারালে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে শ্রমের ক্ষতি প্রতিবছর ৫০০-৬০০ ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে।যা আগের গবেষণার দ্বিগুণ।
জরিপ অনুযায়ী, গত ৪ দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কর্মঘণ্টার ক্ষতি নয় শতাংশ বেড়েছে। জলবায়ুতে সামান্য পরিবর্তন দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও শ্রমশক্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেললে।
আরও পড়ুন: নাসিক নির্বাচন: সব কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ, নিরাপত্তা জোরদার
হিউমিড হিট ও অর্থনীতির সংযোগ
এ গবেষণা ফলাফলের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, হিউমিড হিট সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। আর কর্মক্ষম মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে অর্থনীতির বড় সংযোগ রয়েছে। শীতপ্রধান দেশে গরম কাপড় পরে, হিটার ও আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের গরম রাখতে পারেন মানুষ । কিন্তু বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষদের এ আবহাওয়া থেকে বাঁচার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে তাদের কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। মানুষ প্রচুর ঘামছে। সহজেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদনশীলতায়।
এছাড়া বাংলাদেশের মানুষ স্বল্প দক্ষ কায়িক শ্রমের কাজ করেন। এ ধরনের কাজে শীতল পরিবেশে থাকার এবং কিছুক্ষণ পর পর বিরতি বা বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ নেই। ফলে এত পরিশ্রমের কাজ কেউ দীর্ঘদিন করতে পারে না। বয়সকালে তারা অসুখ বিসুখে ভোগেন এবং কর্মক্ষমতা একদম হারিয়ে ফেলেন। এভাবে একজন মানুষের মোট উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদিশার মতে, একে খালি চোখে ছোট বিষয় মনে হবে। তবে এখনও দেশের বেশিরভাগ কাজ ম্যানুয়াল লেবার বা কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই সার্বিকভাবে এ হিউমিড হিট দেশের গোটা অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন: যুবকের কান থেকে তেলাপোকা বের করলেন চিকিৎসক
অপেক্ষার অবকাশ নেই
পার্সনস বলেন, ’এ গবেষণা একটি বিষয়কে ইঙ্গিত করেছে-সেটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের শ্রম ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এখন তা জানতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে যে উষ্ণতা অনুভব করেছি, সেটাই মানুষের কর্মশক্তির ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতি আরও বিরূপ হয়ে উঠবে।’
এ নিয়ে গত বছর ল্যানসেটের বার্ষিক কাউন্টডাউন অন হেলথ অ্যান্ড হিউম্যানিটি রিপোর্টে সতর্ক করা হয়। বলা হয়, ২০২০ সালে প্রচণ্ড তাপে প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ কোটি ঘণ্টার কাজ নষ্ট হয়েছে।গরিব দেশগুলো গড় সম্ভাব্য আয় হারিয়েছে মোট জিডিপির ৪ থেকে আট শতাংশ।
গত বছর নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর তাপমাত্রার বাড়ছে। ফলে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
একই বছর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলন হয়। এতে বিশ্বনেতারা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাসের মাধ্যমে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। কারণ, ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে গত সাত বছর সবচেয়ে গরম পড়ার রেকর্ড হয়েছে।